মোবাইল ফোনের অপব্যবহার
এত দীর্ঘ আলোচনার প্রেক্ষিতে জানতে পারলাম মোবাইল ফোনের নানাবিধ ব্যবহার তথা উপকারের দিকটা নিয়ে। উপকারের প্রয়োজনীয়তা উপলদ্ধি করে বোধ হয় অনেকের মনটা চাঙ্গা হয়ে উঠেছে ! কিন্তু এতসব বাদ দিয়ে এবার মোবাইল ব্যবহারের অপকারিতার বিষয়টি আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছি। এবার হয়ত আমার প্রতি অনেকেই ক্ষেপে উঠবেন, এবং বলবেন যে এই মিয়া অপকারিতা কোন বিষয় হল নাকি!! অপকারিতা যা হচ্ছে তা মুলত আমাদের মত ব্যবহারকারীর দ্বায়বদ্ধতার কারনেই হচ্ছে। হ্যা ভাই ঠিক কথা বলেছেন বিজ্ঞানের আর্শীবাদ স্বরুপ যে বিষয়ের এত উপকারিতা নিয়ে ঢাকঢোল তথাপি তার উপর আবার কাটার ঘাঁ! উদাহরন হিসাবে বলা যায় কমি্ুটার ব্যবহারের মত মোবাইল ব্যবহারেরও কিছু অপকারিতা তথা কুফল দিক রয়েছে। তাহলে বিষয়গুলো রিভিউ করি কেমন?এক নজরে ক্ষতিকর দিক সমূহঃ
১) বিজ্ঞানীদের মতে, একটি পরমানবিক চুল্লির যে বিপদ তার থেকে মোটেও কম নয় এই ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড এর ক্ষতি। যাদের করোটি যত পাতলা, তাদের মোবাইল এফেক্ট তত বেশি। ব্রেন টিউমার থেকে শুরু করে নার্ভাস সিস্টেম ব্রেকডাউন, হার্ট অ্যাটাক সব কিছুরই সম্ভবনা বেড়ে চলেছে।২) মোবাইল ফোন ব্যবহার এর ফলে আমাদের মস্তিস্কের একটা অংশ উত্তপ্ত হয়ে উঠে। তার ফলে মস্তিষ্কের টিস্যু গুলি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। মগজেও থাকে তার প্রতিক্রিয়া।
৩) ঝড়ের সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে সমূহ বিপদ দেখা যেতে পারে।
৪) বুক পকেটে মোবাইল রাখলে হার্টের সমস্যা হবার সম্ভবনা বেশি থাকে।
৫) ইয়ার ফোন ব্যবহার না করে, কানের গোড়ায় রেখে মোবাইল এ বেশি কথা বললে কানে কম শোনা এমনকি বধিরতার আশঙ্কা পর্যন্ত থাকতে পারে।
৬) বন্ধ্যাত্ব বাড়ছে। অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার করলে মুখে ক্যানসার বা মেলিগনানট টিউমার এর ঝুঁকি বাড়ে।
৭) শিশুদের মস্তিস্কের কোষ নরম বলে তাদের মারত্মক ক্ষতি হচ্ছে। বিজ্ঞানী হাইল্যান্ড দেখিয়েছেন, তড়িৎ চুম্বকীয় দূষণের কারনেই শিশুরা এপিলেপসি ও অ্যাজমায় ভুগছে।
৮) লেফ সেলফড তথ্য-প্রমানের ভিত্তিতে সুদৃঢ় হয়ে যথেষ্ট জোরের সঙ্গে বলেছেন, সেলফোন এর প্রতিটা কল আমাদের মস্তিস্কের ক্ষতি করে। এমন কি প্যাসিভ স্মকারদের মত যে লোকটা মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে না কিন্তু মোবাইল ব্যবহারকারির কাছে রয়েছে সেও ক্ষতি গ্রস্থ হচ্ছে। ফ্রান্সে সান্তিনি আর সুইডেন এ সানডস্তরম আর মাইলড এর সমীক্ষার ফলাফল লেফ সেলফড এর বক্তব্য কে আরও সুদৃঢ় করে তোলে। এঁদের সমীক্ষা অনুযায়ী, সেলফোন ব্যবহারকারি, ২৫% পর্যন্ত বিভিন্ন স্নায়বিক সমস্যায় ভুগছেন।। যেমন, মাথাঘোরা, ক্লান্তি, স্মৃতি শক্তি হ্রাস, মাথা ঝিম ঝিম করা, ক্লান্তি প্রভৃতি।
বড়দের তুলনায় বাচ্চাদের বেশি ক্ষতি হয়। তাই বাচ্চাদের মোবাইল থেকে দুরে রাখুন। কথা বলতে বলতে এক সময় ব্রেইন ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। বাচ্চাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে বলে এদের ক্ষতির পরিমান বেশি থাকে।
এক ডজন স্বাথ্য ঝুঁকি রয়েছে তথা মোবাইল ফোন ব্যবহার করার কারন হিসাবে
মোবাইল ফোন যেমন বিভিন্ন দিক দিয়ে আমাদের উপকার করছে, একইভাবে স্বাস্থ্যগতভাবে আমাদের নানাদিক দিয়ে ঝুঁকির মুখোমুখি করছে। চলুন জেনে নেয়া যাক অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের ফলে স্রিষ্ট ১০ স্বাস্থ্যঝুঁকি।ক। মানসিক চাপ
আমরা ফোন ব্যবহার করি যাতে সব সময় অন্যদের সাথে যোগাযোগ রাখা যায়। কিন্তু এটি একইসাথে আমাদের মানসিক প্রশান্তিও কেড়ে নেয়। কিভাবে? আমরা সব সময় আশা করতে থাকি এই বুঝি ফোনটি বেজে উঠবে কিংবা কেউ হয়তো মেসেজ দিবে।
সচেতনভাবে না হলেও আমাদের অবচেতন মন আমাদের সব মনোযোগ এই ক্ষুদ্র ফোনটির কাছে কেন্দ্রীভূত করে। এধরণের চিন্তার কারণে এক ধরণের মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। প্রতিদিন এক ঘন্টার জন্য ফোনটি সুইচ অফ করে রাখুন। এটি আপনাকে মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দিবে।
গবেষকরা দেখেছেন, বেশিরভাগ মানুষই প্রয়োজন না থাকলেও তাদের মোবাইলের মেনু স্ক্রিন, ই-মেইল বা এপ্লিকেশন চেক করার জন্য বার বার ফোন চেক করে। যদিও নতুন কোন ইমেইল, এস এম এস কিংবা নোটিফিকেশন আসার সম্ভাবনা হয়তো থাকে না বললেই চলে।
এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, যারা সারাক্ষণ তাদের ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তারা যে কোন জরুরী পরিস্থিতিতে অন্যদের তুলনায় ২৩% দেরিতে সক্রিয় হন। যে কারণে বিশ্বের বহু দেশে গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইল ফোনে কথা বলা আইনত নিষিদ্ধ। বেশিরভাগ সময় দেখা যায়, মোবাইল ফোন আমাদের কোন কাজের প্রতি একাগ্রতা নষ্ট করে দেয়। এর ফলে যে কোন কাজ করতে আমাদের স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগে।
গ। মস্তিষ্কের ক্যান্সার
মোবাইল ফোন থেকে সৃষ্ট তেজষ্ক্রিয় রশ্মি আমাদের মস্তিষ্কের কোষগুলোকে ধীরে ধীরে মেরে ফেলতে পারে। মোবাইল ফোন থেকে সৃষ্ট বেতার তরঙ্গ আমাদের মস্তিষ্কের কোষগুলোকে উত্তপ্ত করে তোলে। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই তরঙ্গকে কারসিনোজেনিক বা ক্যান্সার সৃষ্টিকারী বলে ঘোষণা দিয়েছে। অর্থাৎ মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার মস্তিষ্কের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
ঘ। হার্টের সমস্যা
গবেষণায় জানা গিয়েছে, মোবাইল ফোন থেকে সৃষ্ট তেজস্ক্রিয়তা মানুষের হার্টের স্বাভাবিক কর্মকান্ডকে ব্যহত করে। এর ফলে রক্তের লোহিত রক্তকণিকাতে থাকা হিমোগ্লোবিন আলাদা হয়ে যেতে থাকে।
এছাড়া হিমোগ্লোবিন রক্তের লোহিত কণিকার মাঝে তৈরি না হয়ে দেহের অন্যত্র তৈরি হতে থাকে, যেটি বিভিন্ন ধরণের শারীরিক সমস্যা তৈরি করে। যে কারণে বুক পকেটে ফোন রাখা একদমই অনুচিত। এছাড়া যারা হার্টে পেসমেকার বসিয়েছেন তাদের ক্ষেত্রেও মোবাইল ফোন ব্যবহারে যথেষ্ঠ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
আপনার মোবাইল ফোনের কারণেও কিন্তু আপনি অসুস্থ হতে পারেন! কিভাবে? আপনি সারাক্ষণই আপনার প্রিয় ফোনটি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। এতে ধূলোবালি তো জমা হয়ই, সাথে থাকে অনেক রোগ-জীবাণুও। খাবার সময় হলে আপনি হয়তো খুব ভালভাবে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে আসলেন। খাবার খাওয়ার ঠিক আগ মূহুর্তে আপনার ফোন বেজে উঠলো কিংবা একটা মেসেজ এলো, আপনি সেটার রিপ্লাই দিয়ে এসে খেতে বসে গেলেন।
আর এরই সাথে মোবাইল ফোন থেকে প্রায় ২০ থেকে ৩০ ভাগ ব্যাক্টেরিয়া ও ভাইরাস খাবারের সাথে আপনার দেহে প্রবেশ করলো। আপনি হয়ত সাথে সাথে অসুস্থ হবেন না, কিন্তু পরবর্তীতে যেকোন অসুস্থতার জন্য এই বিষয়গুলোই দায়ী থাকবে।
চ। স্নায়বিক সমস্যা
মোবাইল ফোন থেকে নিঃসরিত তেজস্ক্রিয় রশ্মি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে আমাদের ডি এন এ-কে। কোন কারণে মস্তিষ্কের কোষের ডি এন এ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা স্নায়ু সংক্রান্ত বিভিন্ন শারীরিক কাজের ক্ষতিসাধন করে।
মোবাইল ফোনের তেজস্ক্রিয়তা মস্তিষ্কে মেলাটনিনের পরিমাণ হ্রাস করে, যার ফলে বিভিন্ন স্নায়বিক সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া এটি এখন বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, মোবাইল ফোন থেকে নিঃসরিত তড়িত-চৌম্বকীয় তরঙ্গের কারণে অনিদ্রা, আলঝেইমার ও পারকিনসন’স ডিজিজের মত বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়।
ছ। শুক্রাণুর গুনগত মান ও পরিমাণ হ্রাস
এখনকার সময়ে ছেলেদের প্রায় সবাই নিজেদের প্যান্টের পকেটে মোবাইল ফোন রাখে। বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যেসব পুরুষ বা ছেলে খুব বেশি মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন তাদের শুক্রাণু খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া শুক্রাণুর ঘনত্ব হ্রাস পেতে থাকে। আমরা যখন ফোনে কথা বলার পর ফোন পকেটে রেখে দিই, তখন এটি কিছুটা উত্তপ্ত অবস্থায় থাকে। এর ফলে অন্ডকোষের চারপাশে তাপমাত্রা বেড়ে যায়।
অথচ শুক্রাণু দেহের ভেতরে মাত্র ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সক্রিয় থাকে। তাই অতিরিক্ত তাপমাত্রা শুক্রাণুর জন্য ক্ষতিকর। আবার আমাদের শরীর থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণে উপকারী তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরংগ বের হয়, কিন্তু মোবাইল ফোনের উচ্চ মাত্রার তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ আমাদের দেহের তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গের নিঃসরণকে বাধাগ্রস্ত করে। যার ফলে অস্বাভাবিক আকৃতির শুক্রাণু তৈরি হয়।
জ। শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়া
যারা দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ফোনে কথা বলেন তাদের কানের বিভিন্ন সমস্যা যেমন-কানে কম শোনার ঝুঁকি অনেক বেশি। বর্তমানে যাদের বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছর, তাদের মাঝে শ্রবণশক্তি হ্রাসের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। চিকিৎসকদের মতে, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যপক ব্যবহার এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। যারা দৈনিক ২-৩ ঘন্টার চেয়ে বেশি ফোনে ব্যস্ত থাকেন তারা ৩ থেকে ৫ বছরের মাথায় আংশিকভাবে বধির হয়ে যান। তাই এটি রোধ করতে আপনার ফোনের রিং-টোন যতটুকু সম্ভব কমিয়ে রাখুন ও ফোনে খুব বেশি গান শোনা থেকে বিরত থাকুন।
ঝ। চোখের সমস্যা
যারা চোখের খুব কাছাকাছি দূরত্বে রেখে ফোন ব্যবহার করেন তারা ধীরে ধীরে মাথাব্যথা, চোখ ব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা-এরকম নানা রকম সমস্যায় আক্রান্ত হন। এজন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো ফোনের বিভিন্ন লেখার ফন্ট সাইজ বাড়িয়ে দেয়া, চোখ থেকে ন্যুনতম ১৬ ইঞ্চি দূরত্বে ফোন ব্যবহার করা। আর যদি বেশ দীর্ঘ কোন লেখা ফোনে পড়তে হয়, তবে কিছুক্ষণ পর পর ২০ সেকেন্ডের জন্য চোখকে বিশ্রাম দিন।
ঞ। গর্ভাবস্থায় ঝুঁকি
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যেসব নারীরা তাদের গর্ভাবস্থায় খুব বেশি মাত্রায় মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন, তাদের গর্ভস্থ ভ্রূণের মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যহত হয়। এছাড়া পরবর্তীতে এই শিশুদের মাঝে আচরণগত অনেক সমস্যাও দেখা দেয়। তাই গর্ভাবস্থায় মায়েদের উচিত মোবাইল ফোন যতদূর সম্ভব এড়িয়ে চলা।বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোনকে একেবারে জীবন থেকে সরিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। কিন্তু একটু সচেতন হলেই আমরা মোবাইল ফোন ব্যবহারের ফলে তৈরি হওয়া স্বাস্থ্য ঝুঁকি থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারি।
মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে মোবাইল অপারেটরদের কোন সংযুক্ততা আছে কি?
প্রযুক্তির উৎকর্ষে মোবাইল ফোনের আবিষ্কার জীবনযাত্রার মান যতটা বৃদ্ধি করেছে, ঠিক ততটাই অনাচার, মিথ্যাচার ও অপরাধের প্রসার ঘটিয়েছে। মোবাইল ফোনের ব্যবহার যোগাযোগ প্রক্রিয়াকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি এর অপব্যবহার জনজীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। যে দেশের মানুষ তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে পদে পদে হোঁচট খায়, সেদেশে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো বিভিন্ন কৌশলে মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছে মোবাইল ফোন। তারা রক্তচোষা ছারপোকার মতো মানুষের কষ্টার্জিত টাকা চুষে নিচ্ছে। তাদের কষ্টার্জিত উপার্জন মিলিয়ে যাচ্ছে নেটওয়ার্কের অদৃশ্য ফ্রিকোয়েন্সিতে।
মোবাইল ফোনের মাধ্যমে গ্রাহকদের নানান সুযোগ-সুবিধা দিয়ে প্রচুর মুনাফা লুটছে বহুজাতিক অপারেটর কোম্পানিগুলো। ব্যবসায়িক স্বার্থে তাদের দেওয়া নানা প্যাকেজ সুবিধা নিতে গিয়ে এর অপব্যবহারের দিকটাও বৃদ্ধি পাচ্ছে গ্রাহকদের মধ্যে। কয়েকটি মোবাইল অপারেটর কোম্পানি তরুণ প্রজন্মকে টার্গেট করে বিশেষ ধরনের সিম কার্ড বাজারে ছাড়ে। পূর্বের অভিজ্ঞাতে দেখা গিয়েছে তাদের বিশেষ প্যাকেজে রাতভর স্বল্প মূল্যে কথা বলার সুযোগ নতুন প্রজন্মের জন্য বিশেষ হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল যা পড়ালেখা ও ঘুম বাদ দিয়ে অনেক তরুণ-তরুণী রাতভর কথা বলতেন। আমি যখন বেশ ছোট ছিলাম প্রায় ১০-১২ বছর পূর্বে তখন একটেল নামে একটি অপারেটর ছিল (বর্তমান মালিকানা পরিবর্তন করে রবি) তারা ৬০০/- টাকাতে জয় নামে ডাবল সীমের প্যাকেজ চালু করেছিল যেখানে একজন আরেকজনের সাথে সারারাত কথা বললেও ৫ টাকার বেশী খরচ হত না। তথাপি ফূর্তি নামে একটি প্যাকেজ ছিল যেখানে উল্লেখ ছিল “কল করলেও বোনাস, কল ধরলেও বোনাস” ফলে দেখা যেত কারনে-অকারনে ফোন কল এসেই যেত। তরুণে-তরুণীদের টার্গেট করে গ্রামীণ ফোনের একটি প্যাকেজ উঠেছিল ডিজুস নাম করে। সেই সময়ই শুনে ছিলাম ডিজুস এর প্যাকেজ কিনতে নাকি ১৮০০৳ ব্যয় হচ্ছে। ঐ ডিজুসের সুবিধা ছিল একই সারারাত প্রেমালাপ আর তার সাথে তো ছিল ২০০০ এসএমএস।
যাইহোক ঐ সময় পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, বুড়া-বুড়ীড়াই নাকি গ্রামীনের অন্য সব প্যাকেজ বাদ দিয়ে ডিজুজের প্রতি মায়ার টান ধরেছিল। আসলে বোধ হয় সেই সময় এমন পরিস্থিতি হয়েছিল যে, মোবাইলে কথা বলার জন্য বাংলাদেশী হিসাবে গিনেস বুকে নাম উঠাটাই বাকি ছিল। পরবর্তীতে সচেতন নাগরিক মহল, সংবাদ পত্র ও মিডিয়ার পৃষ্ঠকতায় সরকার সহ উদ্ধতন মহলে টনক নড়ে ফলে এক সময় ঐ অফরসমূহ মোবাইল অপারেটর গুলো বন্ধ করতে বাধ্য হয়।
মোবাইল ফোন কোম্পানীর কোন বক্তব্য আছে কি?
আমার এই টিউন পড়ে কিংবা কোন ভূক্ত ভোগীর টিউমেন্টর প্রতিত্তরে হয়ত তারা বলবেন, ভাইরে শুধু কি অামাদের একার দোষ দিলে হবে? আমরা তো ব্যবসা করতে এসেছি এবং সরকারের সব চেয়ে বেশী ভ্যাট/ট্যাক্স প্রদান করি। সুতরাং ব্যবসা করতে গিয়ে এমন করাটাও তো স্বাভাবিক! তোমরাও যদি আমাদের মত কোম্পানী দিতে তাহলে বুঝতে ঠ্যালা!! ক্যান! আমরা কি কাউকে জোর-দবস্তি করছি যে, তোমাদের এই অফারটা কিনতেই হবে?? আরে ভাই সাবান কোম্পানীই তো অফার দিচ্ছে এটা কিনলে ওটা ফ্রি!! কিন্তু কেউ খবর রাখবেনা মাল-মিডিসিনের কোন ব্যাপার আঝে কিনা!! যাও অভিযোগ করতে হলে সরকারি মহলে গিয়ে করো ক্যামন!!সময় এসেছে! মোবাইল ফোনের অপব্যবহার রোধ করবার!!
১। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা এখন দেদারসে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে যন্ত্রটি ব্যবহার করা হলেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তাদের পড়াশোনার ওপর। ক্লাস চলাকালীন ইনকামিং-আউটগোয়িং কল, ফেসবুক-টুইটারসহ অন্যান্য সামাজিক বন্ধনের বন্ধুত্বে লিপ্ত হয়ে ক্লাসে অমনোযোগী হওয়া, রাতভর কম রেটে কথা বলার সুযোগ পেয়ে বাবা-মার চোখ ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি করা, প্যাকেজ রেটে দিনরাত আনলিমিটেড ডাউনলোড করাসহ বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত হচ্ছে ছাত্র সমাজ।
২। ছাত্রছাত্রীরা আজকাল মেমরিকার্ড সমৃদ্ধ মোবাইল ফোনে বইয়ের স্টিল পিকচার নিয়ে আসছে পরীক্ষার হলে। সময় দেখার নাম করে মোবাইল ফোনের ইমেজ ভিউয়ার জুম করে দেখে নিচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বা চিত্রগুলো। এক কথায় নকল করার আধুনিক মাধ্যম হিসেবে তারা বেছে নিয়েছে মোবাইল ফোনকে। কোনো প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলে টয়লেটে যাওয়ার নাম করে পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে ফেসবুকের ওয়ালে সার্কুলেশন করছে। ছোট স্পিকার কানে লাগিয়ে ওয়্যারলেস কানেকশনে উত্তর জেনে নিচ্ছে বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে। নকল করার অপরাধ থেকে বাঙালি যখন পরিত্রাণের উপায় খুঁজছে, ঠিক তখন মোবাইল ফোনের ওপর ভর করে নকল প্রবণতার বিকাশ ঘটছে মহামারী আকারে।
৩। বাসায় কম্পিউটার না থাকা, কম্পিউটার পরিবহনে অক্ষমতা অথবা কম্পিউটারে মডেম সংযোগ ইত্যাদি জটিলতার কারণে মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করে নেটিজেন হচ্ছে দেশের কিশোর ও যুবসমাজ। তারা মুহূর্তেই ডাউনলোড করে নিচ্ছে আজেবাজে ডকুমেন্টস আর ব্লু-টুথ ডিভাইসে তা ছড়িয়ে দিচ্ছে বন্ধু-বান্ধবীদের মোবাইল ফোনে। ফেসবুক, টুইটার, ম্যাসেনজার ইত্যাদি সামাজিক বন্ধুত্বের সাইটে অডিও কনফারেন্স বা চ্যাট করে অলস সময় নষ্ট করছে।
৪। সেবা দেয়ার নাম করে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো বাঙালিদের বুকে টেনে নিলেও তাদের নজর থাকে অর্থ উপার্জনের দিকে। দেশের অর্থ পাড়ি জমায় উন্নত কোন রাষ্ট্র, নয়তো বিদেশী কোন ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে। মোবাইল ফোন যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হলেও শিক্ষার্থীরা এর অপব্যবহারে মগ্ন হয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে মারাত্মক বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছে। সমাজ থেকে তারা বিছিন্ন হয়ে পড়ছে। তারা যেন আটকে যাচ্ছে ২-৩ ইঞ্চির ছোট্ট একটা মনিটরে। বিধ্বংসী এ স্রোত থামাতে না পারলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ।
৫। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দিন দিন বেড়েছে সাইবার ক্রাইমের ঘটনাও। দেখা যাচ্ছে বেনামি সেট কিংবা মোবাইল সীম কার্ড ব্যবহার করে অহরহ ক্রাইম করছে। অবস্থা এমন হয়েছে যে, মাঝেমধ্য গোয়েন্দা সংস্থাকে রহস্যর জট উদঘাটন করতে বেগ পোহাতে হচ্ছে। বর্তমানে সরকারের টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় একটি শুভ উদ্যোগ গ্রহন করেছে তাহলো এই বছরের ডিসেম্বর মাস হইতে যারা নতুন সংযোগ নিবেন তাদের সীম কার্ড রেজি: সহ বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে আঙ্গুলের ছাপ প্রদান করতে হবে। নি:সন্দেহ একটি ভাল উদ্যোগ এবং আমি সহ যাবতীয় প্রযুক্তিপ্রেমী স্বাগত জানাই। কারন কিছুটা হলেও এর মাধ্যমে মোবাইল ক্রাইম রোধ করা যাবে।



No comments:
Post a Comment